কালের দুরবীনে বিজ্ঞানসাধক নিউটন

 

রেনেসাঁসের যুগে (14-17 শতাব্দী) যেন এক মন্ত্রবলে সাহিত্য, চিত্রকলা, বিজ্ঞান, ধর্মচর্চা বহু অন্যান্য ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা হয় এবং যুগের শেষভাগে আবির্ভূত হন বিজ্ঞান জগতের দুই উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক, গ্যালিলেও নিউটন | গ্যালিলেও আধুনিক পদার্থবিদ্যার জনক হলেও নিউটনই সরব কালের শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক হিসাবে স্বীকৃত | সম্প্রতি লণ্ডনের রয়াল সোসাইটি, নিউটন না আইনষ্টাইন, কার অবদান বিজ্ঞানজগতে বেশী নিয়ে  বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে এক সমীক্ষা করে যাতে নিউটনই সরবশ্রেষ্ঠ গণ্য হন | গ্যালিলেওর মৃত্যু হয় 1642 খৃষ্টাব্দে এবং সেই বত্সর 25শে ডিসেম্বর নিউটনের জন্ম হয় ইংল্যাণ্ডের উলসথর্প গ্রামের এক জমিদার পরিবারে | তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা গ্রামের বিদ্যালয়ে পরে নিকটবর্তী গ্র্যান্থামের  কিংস গ্রামার স্কুলে যা ছিল ত্রিশতবর্ষেরও অধিক প্রাচীন |

 

                            নিউটনের দস্তখত

 

জন্মের কিছু পূরবে তাঁর পিতার মৃত্যু হয এবং মা পুনরায় বিবাহ করেন নিকটবর্তী নর্থ উইথামের রেক্টর বার্নাবাস স্মিথকে | শৈশবে মাতা-পরিত্যক্ত নিউটনকে প্রতিপালন করেন তাঁর মাতামহী | মাতৃস্নেহের অভাব নিয়ে নিউটনের মনে গভীর ক্ষোভ ছিল এবং এজন্য তিনি বার্নাবাস কে দায়ী করতেন | তবে দুজনের মধ্যে দুরত্ত্বের হয়তো অন্য কারণও ছিল | নিউটনের মা শিক্ষিতা হলেও পিতা আইজাক ছিলেন অশিক্ষিত অথচ বার্নাবাস ছিলেন অক্সফোর্ডের এম. এবং খুবই ধনী | তাঁর লাইব্রেরীতে বহু বই ছিল যেগুলি পরে নিউটনের হাতে আসে | উল্লেখনীয় যে বিয়ের স্বর্তহিসাবে বার্নাবাস  নিউটনের নামে কিছু জমি লিখে দেন এবং পরেও নিউটন আরো সম্পত্তি পান | 1653 সালে তাঁর মৃত্যুর ছয় বত্সর পরে মা তাকে স্কুল ছাডিয়ে উলসথর্পে নিয়ে আসেন জমিদারীর কাজ দেখাশোনার জন্য কিন্তু এতে নিউটনের সায় ছিল না | ভাগ্যক্রমে তাঁর মামা উইলিয়াম অ্যাইসকফ গ্র্যান্থাম স্কুলের  প্রধান শিক্ষক স্টোকস নিউটনের অসামান্য প্রতিভার আন্দাজ পেয়েছিলেন এবং তাদের পরামর্শেই মা তাকে আবার স্কুলে পাঠান | এছাডাও কিশোর নিউটনের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়েছিলেন গ্র্যান্থামের ডাক্তার ক্লার্ক যার শ্যালক হামফ্রি ব্যাবিংটন ছিলেন কেম্ব্রিজের ট্রিনিটি কলেজের ফেলো | নিউটনের মামা ছিলেন ধর্মযাজক অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এম. . | তাঁর এবং ব্যাবিংটনের উত্সাহেই নিউটন কেম্ব্রিজে ট্রিনিটি কলেজে ভর্তি হন |

 

                                  বিজ্ঞানের ইতিহাসে যুগান্তর আনে প্রিন্সিপিয়া

 

ছাত্রাবস্থায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন প্রথমে ধর্মযাজক হওয়ার জন্য, কিন্তু পরে গণিত অধ্যয়ন করেন | শৈশব কৈশোরে তাঁর পরবর্তী জীবনের অসাধারণ প্রতিভার স্ফুরণের কোন ইঙ্গিত ছিল না বলা হয় কিন্তু তা ঠিক সত্য নয় | আসলে শৈশবে তাকে নিয়ে কারো বিশেষ মাথাব্যাথা ছিল না |  আইনষ্টাইনের মত তিনিও স্কুলে প্রথম হন নি, কিন্তু তাঁর প্রতিভা ছিল সৃজনশীল দৃষ্টি ছিল অন্যদিকে | এইসময় গ্র্যান্থামের অদুরে একটি উইণ্ডমিল তৈরী হয় যা সমাজে সাডা ফেলে | নিউটন এর এক অনবদ্য কাঠের মডেল তৈরী করে সকলকে অবাক করেন | এছাডাও তিনি  ঘডি, সঙ্গীদের জন্য পুতুলখেলার নিখুত ফার্ণিচার সৌর ডায়াল তৈরী করেন যা সহজসাধ্য ছিল না | এই যন্ত্রকুশলতার পরিচয় তাঁর পরিণত বয়সে রিফ্লেক্টিং টেলিস্কোপ তৈরীর মধ্যেও পাওয়া যায় |

 

  

বার্ট্রাণ্ড রাসেল হালকা সুরে লেখেন যে শেক্সপীয়ার যদি চার্লেকোট পার্কে অনধিকার প্রবেশ করে হরিণ শিকার করতে গিয়ে ধরা না পরতেন তবে হয়তো তিনি সাহিত্যিক না হয়ে পশম ব্যবসায়ী হতেন | পিতার অকালমৃত্যু না হলে এবং মা বার্ণাবাসকে বিয়ে না করলে নিউটন কি হতেন তা বলা দুঃসাধ্য | মাকে কাছে না পাওয়ার বেদনাই হয়তো তাঁকে বার্ণাবাসের চেয়েও শিক্ষিত ও সফল হওয়ার প্রেরণা যোগায় | 1663  সালে স্টুরব্রিজের মেলায় নিউটন ইউক্লিডের জ্যামিতি কেনেন এবং অনায়াসেই আয়ত্ত করেন | 166 5 খৃষ্টাব্দে তিনি যখন বি. এ. ডিগ্রী পান  তখন  প্লেগের কারণে কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হযে যায় | নিউটন উলসথর্পে ফিরে আসেন এবং পরবর্তী দুই বত্সর অধ্যয়ন ও গবেষণায় গভীর মনোনিবেশ করেন | স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি পরবর্তীকালে লেখেন যে 1666ই ছিল তাঁর জীবনের বিস্ময়কর পরব (কবি ড্রাইডেনের ভাষায় অ্যানুস মাইরাবিলিস), যখন তাঁর সৃজনীশক্তির চুডান্ত বিকাশ হয় | ক্যালকুলাস, বলবিদ্যা, আলোকবিদ্যা ও মধ্যাকর্ষন তত্ত্বের গোডাপত্তন সবই এই সময় হয় |  

    গণিতশাস্ত্র ও পদার্থবিদ্যায় নিউটন বহু বিষ্ময়কর আবিস্কার করেন | গণিতশাস্ত্রে তাঁর প্রধান অবদানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ডিফারেনশিয়াল ক্যালকুলাস (অন্তরকলন) ইন্টিগ্র্যাল ক্যালকুলাস (সমাকলন) | নিউটন তাঁর আবিস্কার প্রকাশিত করতে খুব একটা উত্সাহী ছিলেন না, যে ভুলের জন্য তাকে অনেক মাশুল দিতে হয় |  জ্যোতিরবিদ বন্ধু এডমন্ড হ্যালী হস্তক্ষেপ না করলে তাঁর যুগান্তকারী বই প্রিন্সিপিয়া হয়তো ছাপাই হত না | জার্মান মনীষী লাইবনিত্স তাঁর ক্যালকুলাস সংক্রান্ত গবেষনার ফল নিউটনের আগে প্রকাশ করেন ও নিজেকে ডিফারেনশিয়াল ইন্টিগ্র্যাল ক্যালকুলাসের প্রকৃত আবিস্কর্তা বলে দাবী করেন | এ নিয়ে তুমুল তর্কবিতর্কের সৃষ্টি হয় যা দুপক্ষেরই ক্ষতি করে | নিউটন অভিযোগ করেন লাইবনিত্স তাঁর কাজ প্রকাশনার আগে লণ্ডনে এসেছিলেন যখন তিনি অল্ডেনবার্গ মারফত তাঁর গবেষনা সম্পর্কে খোজ খবর নেন |  লাইবনিত্স লণ্ডনের রয়্যাল সোসাইটির কাছে আবেদন করেন প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য এবং সোসাইটি এ বিষয়ে অনুসন্ধানের ভার এক কমিটির হাতে দেন যারা নিউটনের পক্ষে রায় দেয় | নিউটন রয়্যাল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং অভিযোগ ওঠে যে কমিটি তাঁর হয়ে পক্ষপাতিত্ত্ব করছে | ভলতেয়ার নিউটনকে সমর্থন করেন ও পরবর্তীকালে লাইবনিত্সের কথা কিছুটা চাপা পরে যায যদিও বর্তমানে তাঁর পক্ষ নিয়ে বার্ট্রাণ্ড রাসেল ও অন্যান্যেরা লিখেছেন যে লাইবনিত্স ছিলেন অতি উচ্চমানের দার্শনিক যিনি  স্বতন্ত্রভাবে ক্যালকুলাসের পদ্ধতিগুলি আবিস্কার করে থাকতে পারেন | তবে এমনকি লাইবনিত্স অনুগামী রাসেলও স্বীকার করেন যে নিউটন ক্যালকুলাস আগে আবিস্কার করেছেন | গণিতে নিউটনের অসামান্য অন্য আবিস্কার যেমন বাইনোমিয়াল থিওরেম (দ্বিপদ উপপাদ্য) এ্যাপ্প্রক্সিমেশন মেথড (আসন্ন মান নিরূপণ প্রক্রিয়া) নিউটনের গানিতিক প্রতিভার মৌলিকতার সাক্ষ্য দেয় যা  লাইবনিত্সের তুলনায় শ্রেষ্ঠতর | সম্যকভাবে বিচার করলে দেখা যায যে এমনকি গণিতশাস্ত্রের স্তম্ভস্বরুপ টেইলার থিওরেমের আবিস্কারের সূত্রও নিহিত  ছিল নিউটনেরই গবেষণায় | মধ্যাকর্ষণ নিয়ে লাইবনিত্সের ধারণা ছিল  অসচ্ছ যদিও তিনি স্থান-কালের আপেক্ষিকতার কথা লেখেন যা নিউটন উপলব্ধি করেন নি এবং যা আইনষ্টাইন পরে আরো সম্প্রসারিত করেন | তখন লণ্ডন ও প্যারিসের মধ্যা রেষারেষি ছিল গবেষনা নিয়ে - লাইবনিত্স ও দেকার্ত ছিলেন একদিকে আর নিউটন, ব্যারো ও ওয়ালিস ছিলেন আরেকদিকে | একমাত্র জ্যামিতির ক্ষেত্রে নিউটন অপেক্ষা দেকার্তের অবদান বেশী মনে হয় |

          নিউটনের বলবিদ্যা (মেকানিকস) সমগ্র বিজ্ঞান যন্ত্রবিদ্যার বুনিয়াদ | প্রকৃতপক্ষে বলবিদ্যার ভিত্তি প্রস্তুত করেন গ্যালিলেও যা নিউটন অনেক সম্প্রসারিত করেন কলনবিদ্যার সাহায্যে | বলা হয় বাগানে আপেল পডার দৃশ্য দেখে নিউটনের মনে চিন্তা জাগে, যে কারণে ফলটি মাটিতে পডে সেই কারণেই পৃথিবী সূরযের চারিদিকে প্রদক্ষিন করে | মধ্যাকর্ষণ তত্ত্বের এই জন্মকাহিনীটি মনে হয় সত্য | মধ্যাকর্ষণতত্ত্ব বহিরবিশ্ব সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান অনেক প্রসারিত ও সম্বৃদ্ধ করেছে যদিও স্থান-কালের আপেক্ষিকতার কথা নিউটনের তত্ত্বে না থাকায় বহু প্রশ্নের সমাধান অধরা রয়ে গেছে | তবে বল সম্পর্কে নিউটনের ধারণা বর্তমানে বিজ্ঞানী মহলে স্বীকৃত নয় |  নিউটনের ধারণা অনুযায়ী দুইটি কণা অথবা বস্তুর মধ্যে বল কোন মাধ্যমের মধ্যস্থতা ব্যতিরেকেই ফলিত হয় | এই অ্যাকশন অ্যাট এ ডিসট্যান্স তত্ত্বের প্রথম ধাক্কা আসে উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক থিওরী থেকে | আইনষ্টাইনও এই তত্ত্বের সমালোচনা করেন | শুন্য মাধ্যমে আলোকের গতি (C) যে অসীম নয় একথা সপ্তদশ শতাব্দীতে জানা ছিল না |

নিউটন আশ্চরয হয়ে লক্ষ্য করেন যে কোন বস্তুর ভর (মাস =m) শুধু তার গতিপরিবর্তনের হারকে(অ্যাক্সিলারেশন) নিয়ন্ত্রন করে না, তার মধ্যাকর্ষণ বলও সেই একই ধ্রুবক m এর সমানুপাতিক | তাঁর তত্ত্বে এর কোন ব্যাখ্যা না থাকলেও আইনষ্টাইন এই দুইয়ের মধ্যে সূত্র খোজেন এবং সফলভাবে ব্যাখ্যা করেন | বিষয়টি জটিল হলেও সহজ কথায় উত্তরটি আইনষ্টাইনের ইকুইভ্যালেন্স প্রিনসিপলে নিহিত আছে যার অর্থ কোন পরযবেক্ষকের পক্ষেই স্থানীয়ভাবে অ্যাক্সিলারেশন এবং মধ্যাকর্ষণের মধ্যে কোন পার্থক্য বোঝা সম্ভব নয় | আইনষ্টাইনের তত্ত্বে স্থান-কালের জ্যামিতিক বক্রতার পরিমাপ দিয়ে মধ্যাকর্ষণ ব্যাখ্যা করা হয় |            আইনষ্টাইন দেখান যে কোন বস্তুর ভর তার শক্তির(E)পরিমাপও দেয় | তাঁর সূত্র E=mC2 র্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আবিস্কার হিসাবে গণ্য হয় যা আনবিক বোমার আবিস্কারকেও প্রভাবিত করেছে | 1927 খৃষ্টাব্দে নিউটনের মৃত্যুর দ্বিশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক বক্তৃতায় আইনষ্টাইন নিউটনের ভুয়সী প্রশংসা করেন | তবে পদার্থবিদ হিসাবে অনন্য হলেও আইনষ্টাইন নিউটনের  তুলনায় গণিতে কম পারদর্শী ছিলেন | তিনি তাঁর নিজের আবিস্কৃত ডিফারেনসিয়াল ইকুয়েশনের যথাযথ সমাধান করতে ব্যর্থ হন |  প্রথমে যথাযথভাবে সমীকরণগুলির সমাধান করেন রুশ গণিতজ্ঞ আলেক্সাণ্ডার ফ্রীডম্যান ও প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের পাদ্রী লেমাইতর এবং পরে অন্য পণ্ডিতেরা আরো যথাযথ সমাধান দেন | সপ্তম সমাধানের কৃতিত্ত্ব কলকাতার গণিতজ্ঞ সুধাংশু দত্তমজুমদারের |    

           1664 খৃষ্টাব্দে সূরযের আলো ত্রিশিরা কাঁচ (প্রিসম) দ্বারা বিভাজিত করিয়া নিউটনই প্রথম সপ্তবর্ণবিশিষ্ট বর্ণালীর অস্তিত্ত্ব প্রমাণ করেন | আলোকবিদ্যার ইতিহাসে এই আবিস্কারের গুরুত্ত্ব অপরিসীম | তাঁর অপটিকস গ্রন্থ আলোক সম্পর্কে আরো বহু বিষয়ে নবদিগন্তের সূচনা করে | আলোর প্রতিসরণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নিউটন আলোককে কণার সমষ্টি হিসাবে চিন্তা করেন কিন্তু গ্রিমাল্ডি আবিস্কৃত আলোর বিচ্ছুরণ(ডিফ্রাকশন) প্রসঙ্গে তিনি আলোককে তরঙ্গ হিসাবে দেখার প্রযোজনীয়তাও উপলব্ধি করেন | নিউটন একটি সমতল ও গোলক কাঁচের মধ্যে আলোকের ইনটারফিয়ারেন্সের জন্য সৃষ্ট বলয়রাশি আবিস্কার করেন যা নিউটনের রিং নামে পরিচিত | এই আবিস্কারের কৃতিত্ত্ব অবশ্য রবার্ট হুকের প্রাপ্য কেননা তিনিই প্রথম এই বলয়রাশি সম্বন্ধে লেখেন | মহাকবি গ্যেটে নিউটনের আলোকবিদ্যার তত্ত্ব অস্বীকার করেন |            

বয়োজ্যেষ্ঠ রবার্ট হুক রয়্যাল সোসাইটির কিউরেটার ছিলেন যার  সঙ্গে নিউটনের সম্পর্ক মধুর ছিল না | অভিযোগ করা হয় যে হুকের একমাত্র ছবি ধ্বংস করার পিছনে নিউটনের হাত ছিল | হুক খুবই দক্ষ গবেষক হলেও তাঁর গণিতে দখল ছিলনা এবং এ নিয়ে তিনি নিউটনকে হিংসা করতেন | নিউটনের রিফ্লেক্টিং টেলিস্কোপ  আবিস্কারকে তিনি অযথা ছোট করার চেষ্টা করেন | 1675 খৃষ্টাব্দে নিউটন মানসিকভাবে ভেঙ্গে পরেন এবং পুরোপুরি সুস্থ হতে তাঁর প্রায় চার পাঁচ বত্সর সময় লাগে | 1679 খৃষ্টাব্দে হুককে লেখা একটি চিঠিতে তিনি অভিমত প্রকাশ করেন যে একটি বস্তুকণা যদি ঘূর্ণায়মান পৃথিবীর দিকে পরতে থাকে তবে মধ্যাকর্ষণের কারণে তার পথটি একটি ক্রমসংকুচিয়মান স্পাইরালের মত হবে | হুক একথা অস্বীকার করে লেখেন যে পথটি হবে একটি পরিবৃত্তের মত | এছাডা রবার্ট হুক ও এডমণ্ড হ্যালী হয়তো আগেই মধ্যাকর্ষণের ইনভার্স স্কোয়ার ল সম্বন্ধে অবগত ছিলেন যা নিউটনের তত্ত্বের ভিত্তি | আলোকবিদ্যায় তাঁর মতামত নিয়ে যখন তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয় তখন নিউটন আত্মপক্ষ সমর্থনে লেখেন, তত্ত্ব আলোচনার শ্রেষ্ঠ নিরাপদ পদ্ধতি প্রথমে কোনও বিষয়ে বস্তুসমূহের গুণাগুণ বিষয়ে অনুসন্ধান করা পরীক্ষার সাহায্যে স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়াপরে তাহাদের ব্যাখ্যার জন্য ধীরভাবে অনুমানের পথে অগ্রসর হওয়া উচিত | বিজ্ঞানের পদ্ধতি সম্বন্ধে এই ব্যাখ্যা আজও অপরিবর্তিত |

  নিউটন কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লুকেসিয়ান অধ্যাপকের পদ গ্রহণ করেন মাত্র 27 বত্সর বয়সে | প্রাক্তন অধ্যাপক এবং নিউটনের শিক্ষক আইজাক ব্যারো স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন তাঁর জন্য জায়গা করে দিতে | ঘটনাটি কেবল আইজাক ব্যারোর মহত্ত্ব নির্দেশ করে না বিজ্ঞানী হিসাবে নিউটন কেমন সাডা ফেলেছিলেন তারও ইঙ্গিত দেয় | ব্যারো পরবর্তীকালেও নিউটনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন | ক্যালকুলাসের আবিস্কারেও ব্যারোর মৌলিক অবদান ছিল যা নিউটন এবং অন্য পরবর্তী গবেষকদের প্রভাবিত করে | প্রকৃতপক্ষে নিউটনের অসামান্য প্রতিভার স্বীকৃতি প্রথম আসে তাঁর প্রাক্তন শিক্ষক ব্যারোর কাছ থেকে | 1668 খৃষ্টাব্দে নিকোলাস মেরকাটরের বিখ্যাত বই লগারিথমো টেকনিকা প্রকাশিত হয় যাতে প্রথম log(1+x) একটি অসীম সংখ্যামালা বা ইনফাইনাইট সিরিজ হিসাবে দেখান হয় | বইটি 1669 খৃষ্টাব্দে ব্যারোর হাতে আসে এবং তিনি অবাক হন এই দেখে যে অনুরূপ অসীম সংখ্যামালা নিউটন তাকে পরাবৃত্ত সংক্রান্ত একটি যে গবেষনাপত্র দেখিয়েছিলেন তাতে ছিল | ব্যারো মন্তব্য করেন যে নিউটনের পদ্ধতি আরো বেশী সারবজনীন এবং এর পরেই তিনি লুকেসিয়ান অধ্যাপকের পদ থেকে ইস্তাফা দেন এই পদে নিউটনের নিযুক্তির জন্য | ইদানীংকালে গবেষকেরা দেখিয়েছেন যে প্রায় দুই শতাব্দী আগে ভারতের কেরালার গণিতজ্ঞেরা অসীম সংখ্যামালা দিয়ে ত্রিকোণমিতির সাইন ও কোসাইন ফাংশনের মান নিরুপন করেছেন |                                               

স্বাভাবিকভাবেই নিউটনের তত্ত্ব ছাত্রদের কাছে অত্যন্ত দুরূহ ঠেকত এবং শোনা যায় প্রায়ই তিনি প্রায় শুন্য ক্লাসে বক্তৃতা দিতেন | বর্তমান লুকেসিয়ান অধ্যাপক ষ্টিফেন হকিং তাঁর কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস গ্রন্থের জন্য বিশ্ববিখ্যাত | তাঁর পূরবে লুকেসিয়ান অধ্যাপক ছিলেন নোবেল পুরস্কার জয়ী বিজ্ঞানী পল ডিরাক যার আবিস্কৃত গতিবিদ্যার সমীকরণগুলি নিউটনের সমীকরণগুলিকে প্রতিস্থাপিত করেছে | নিউটনের সমীকরণগুলি পরমাণুর মত ক্ষুদ্র কণা এবং আলোকের গতির সঙ্গে তুলনীয় গতিসম্পন্ন বস্তুসমূহের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় | এছাডাও ডিরাক আবিস্কার করেন ফার্মি-ডিরাক পরিসংথ্যান য়ার জমজ ভাই হচ্ছে সত্যেন্দ্রনাথ বসু আবিস্কৃত বসু-আইনষ্টাইন পরিসংথ্যান |

দৈনন্দিন জীবনে নিউটন কেমন মানুষ ছিলেন কৌতুহল স্বাভাবিক এবং নিয়ে বিস্তর লেখা হয়েছে | চেখভের চরিত্রগুলির মত নিউটনও দোষগুণ মিলেই এক ব্যক্তিত্ত্ব ছিলেন যার গুণের পাল্লা অনেক বেশী ভারী ছিল | তিনি বিবাহ করেন নি, নিজের কৌমারয নিয়ে খুবই সচেতন ছিলেন এবং পরবর্তী জীবনে স্ত্রীলোকদের থেকে দুরে থাকতেন, কিন্তু তাকে বিবাহ বিরোধী (মিসোগ্যামিষ্ট) বলা যায়, স্ত্রীবিদ্বেষী নয় | গ্র্যান্থামের ডাক্তার ক্লার্ক, য়ার বাডীতে ছাত্রাবস্থায় নিউটন থাকতেন, তাঁর দুই পুত্র আর্থার এডওয়ার্ড নিউটনের খেলার সঙ্গী ছিল | বিশ বত্সর বয়সে লেখা তাঁর অকপট স্বীকারোক্তিতে নিউটন এডওয়ার্ডের চেরী কব চুরি করার জন্য দুঃথপ্রকাশ করেন | ক্লার্কের এক সুন্দরী কন্যা ছিল যিনি পরে মিসেস ভিনসেন্ট হন | সম্ভবতঃ যৌবনে নিউটন একে ভালবেসে ছিলেন | গ্রামে গেলে তিনি এর সঙ্গে দেখা করতেন এবং প্রয়োজনে অর্থসাহায্য দিতেন | মামা উইলিয়ামের কাছে তিনি ঋণী ছিলেন এবং মামাতো বোন ক্যাথারিণ র্যাষ্টাল যখন 1714 খৃষ্টাব্দে নিস্ব হয়ে তাঁর দ্বারস্থ হন তখন তিনি তাকে মুক্তহস্তে অর্থসাহায্য দেন |

          নিউটনের বিশেষ স্নেহভাজন ছিলেন তাঁর ভাগ্নী ক্যাথরীন বার্টন(সতবোন হানা স্মিথের কন্যা) তার স্বামী জন কণ্ডুইট যিনি নিউটনের মৃত্যুর পর মিন্টের মাষ্টার হন | লণ্ডনে অকৃতদার মামার বিশাল বাডী সামলানোর দায়িত্ত্ব বহুদিন বহন করেছেন ক্যাথরীন | শুধু ইংল্যাণ্ড নয় সারা ইওরোপে তাঁর রূপ গুণের খ্যাতি ছিল | সেযুগের বিশিষ্ট ফরাসী গণিতজ্ঞ পরিসংথ্যানবিদ রেমঁ দ্য মঁমর্ত নিউটনের সঙ্গে দেখা করতে এসে ক্যাথরীনকে দেখে এতই মুগ্ধ হন যে তিনি ফ্রান্সে ফিরে  পঞ্চাশ বোতল শ্যাম্পেন উপহার পাঠান এই লিখে যে এগুলি বিশিষ্ট দার্শনিক মিস বার্টনের মত সুন্দরীদের জন্য | কবি রাজনীতিক চার্লস মন্টেগু (হ্যালিফ্যাক্সের আর্ল) ক্যাথরীনের প্রেমে পডেন বিয়ের প্রল্তাব দেন কিন্তু তা ফলপ্রসূ হয় নি | ইংল্যাণ্ডের রাজ পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল | বিশিষ্ট লেখক ভলতেয়ার ও জোনাথন সুইফট ক্যাথরীনের অনুরাগী ছিলেন | ভলতেয়ার নিউটনকে বিশেষ শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন তবু রসিকতা করে লেখেন যে নিউটনের বিশ্বব্যাপী খ্যাতি তাঁর মেধার জন্য নয়, অপরূপ সুন্দরী ভাগ্নীর জন্য | নিউটনকে অহংকারী ও অনুভুতিহীন বৈজ্ঞানিক হিসাবে চিত্রিত করা হয় যা পুরোপুরি সত্য নয় | ভাগ্নী ক্যাথরীনের গুটিবসন্ত রোগের সময় তাকে লেখা নিউটনের চিঠি তাঁর স্নেহ ও সংবেদনশীলতার পরিচয় দেয় | তিনি তাকে গরম দুধ খাওয়ারও পরামর্শ দেন তাডাতাডি সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য |

মিন্টের মাষ্টার পদ গ্রহণ করার আগে নিউটন আলকেমি নিয়ে নিষ্ফল গবেষনা করেছেন প্রায় ত্রিশ বত্সর এবং এ বিষয়ে আনুমানিক তিন হাজার পাতা লিখেছেন যার সবটাই প্রকাশনার অযোগ্য বলে বিবেচিত হয় চেখভ, ইবসেন প্রমুখ সাহিত্যিকেরা তাদের লেখায় বিফল গবেষকের মর্মবেদনা সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যদিও নিউটনের ব্যর্থতা আলকেমির গণ্ডীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল | জীবনের শেষ ত্রিশ বত্সর আইনষ্টাইনও ইউনিফাইড ফিল্ড থিওরী আবিস্কারের বিফল প্রচেষ্টা করেন | সোনা তৈরী, না অন্য কি নিউটনের লক্ষ্য ছিল তা নিশ্চিত নয় কিন্তু তাঁর এক ভৃত্যের বিবরণ থেকে জানা যায় রাতের পর রাত জেগে কি অমানুষিক পরিশ্রম করেছেন তিনি আবিস্কারের নেশায় | সে যুগে আলকেমি ও রসায়নের মধ্যে বিভেদ স্পষ্ট ছিল না, রজার বেকন ও টাইকো ব্রাহের মত চিন্তানায়কেরা আলকেমিতে মনোনিবেশ করেছেন | ভারতেও নাগার্জুন আলকেমি নিয়ে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন | অন্যান্য কিমিয়াবিদদের মত

 

  

নিউটনেরও ধারণা ছিল যে প্রতি বস্তুরই এক মূল উপাদান আছে যার সঙ্গে বহু অপদ্রব্য মিশ্রিত আছে | অগ্নির সাহায্যে অথবা অন্য প্রকারে শোধন করিতে করিতে এক সময় হয়তো সেই মূল উপাদানটি পৃথক করা যাবে যা দিয়ে অসাধ্য সাধন সম্ভব | মোমবাতি উল্টে তাঁর আলোকবিদ্যা গণিতের গবেষণার বহু কাগজপত্র যে আগুনে পূডে যায় একথা সত্য তবে এটা তাঁর কুকুর ডায়ামণ্ডের কীর্তি নাও হতে পারে কেননা তাঁর নকলনবিশ হামফ্রি নিউটন লিথেছেন যে তিনি তাঁর পোষা কুকুরকে পডার ঘরে ঢুকতে দিতেন না | সমসাময়িক অনেক নথিতে নিউটনের বইয়ের পাণ্ডুলিপি আগুনে পূডে যাওয়ার কথা আছে কিন্তু কুকুরের উল্লেখ আছে মাত্র একটিতে যা পরে লেখা হয় | আলকেমি গবেষণায় নিউটনের দোসর ছিলেন তাঁর বিশেষ প্রিয়পাত্র সুইস গণিতজ্ঞ নিকোলাস ফাতিও যিনি ছিলেন এক বর্ণময ব্যক্তিত্ত্ব | নিউটনের আরেক সহযোগী ছিলেন উইলিয়াম জোনস যার পুত্র স্যার উইলিয়াম জোনস কলকাতা সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হন | তিনি পাটনায় চন্দ্রগুপ্তের মৌরযের রাজধানী আবিস্কারের দাবী করেন কিন্তু এর কোন প্রত্নতাত্ত্বিক ভিত্তি নেই | 

          জীবনের অন্য মেরুতে ছিলেন নিউটনের দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু যাজক স্যামুয়েল ক্লার্ক হেনরী মোর | গ্র্যান্থাম স্কুলের ছাত্র মোর তাঁর সাধুসুলভ চরিত্র ও পাণ্ডিত্যের জন্য বিখ্যাত ছিলেন | তিনি নিউটনের চেয়ে কেবল বয়োজ্যেষ্ঠই ছিলেন না তাঁর প্রভাব নিউটনের আলকেমি গবেষনায় ও  ধর্মভাবনায় স্পষ্ট | তিনি লণ্ডনে অনেক বেশি উপার্জনের সুযোগ হেলায় প্রত্যাখ্যান করে সারাজীবন কেম্ব্রিজেই কাটান | মোর হবসের বস্তুবাদের বিরোধীতা করেন এবং তাঁর মতে যুক্তিই শেষ কথা নয় | নিউটন  নাস্তিক ছিলেন না, তাঁর বন্ধু মোরের লেখা য়্যান্টিডোট এগেইনষ্ট এথেইজম অথবা নিরীশ্বরবাদের দাওয়াই তাঁর ধর্মভাবনা সম্বন্ধে আমাদের কিছু সংকেত দেয় | স্যামুয়েল ক্লার্ক এক অর্থে নিউটনের শিষ্য ছিলেন যার সঙ্গে বন্ধুত্ত্ব হয় কেম্ব্রিজে | পরে তিনি লণ্ডনে নিউটনের বাডীর কাছে পিকাডিলির সেন্ট জেমস চার্চের রেক্টর নিযুক্ত হন | তিনি 500 পাউণ্ড পারিশ্রমিক নিয়ে নিউটনের অপটিকস গ্রন্থ লাতিনে অনুবাদ করেন | সেযুগে ধর্ম নিয়ে মুক্তচিন্তার সুযোগ কম ছিল  এবং কারয্যতঃ ক্লার্ক ছিলেন নিউটনের মুখপাত্র যিনি প্রায়ই চার্চের রক্ষণশীল নেতাদের কোপে পরতেন |  কোপারনিকাস চার্চের ভয়ে পৃথিবী সূরযের চারিদিকে ঘোরে, এ তত্ত্ব প্রকাশ করতে অনেক দেরী করেন | নিউটনও ধর্ম নিয়ে লেখা তাঁর নোটগুলি একটি বড কাঠের বাক্সে লুকিয়ে রাখতেন | শোনা যায় তাঁর মৃত্যুর পর চার্চ অব ইংল্যাণ্ডের বিশপ হর্সলি এই বাক্স খুলে দু একটি নোট পডে পরম বিরক্তি ও বিতৃষ্ণায় ঢাকনা বন্ধ করে দেন | অন্যান্য বহু বৈজ্ঞানিকের মত নিউটনও অসীম বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ঈশ্বরের প্রতিকৃতি দেখতেন চিরায়ত ধর্মের বহিরাবরণ নিয়ে আগ্রহী ছিলেন না |

নিউটনের জন্ম ইংল্যাণ্ডের রাষ্ট্রবিপ্লবের কালে যে বিপ্লবের এক হোতা ছিলেন কবি জন মিল্টন | নৈরাজ্যের সেই নিদারুন ভগ্নস্তুপ থেকে বৃটিশ সমাজে আবার প্রানসঞ্চার হয় এবং দেখা দেন নিউটন, হুক, লকে, ড্রাইডেন ও মিল্টনের মত মনীষীরা | মিল্টনও কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন | 1632 খৃষ্টাব্দে তিনি ক্রাইষ্টস কলেজের এম. এ. ডিগ্রী পান | মিল্টনের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকীর্তি প্যারাডাইস লস্ট প্রকাশিত হয় 1667 সালে যা 25 বত্সরের যুবক নিউটনের জীবনেরও সবচেয়ে দীপ্তিময় অধ্যায় | রাজনীতিতে মিল্টন ছিলেন ক্রমওয়েলপন্থী যার বিপরীতে ছিলেন নিউটন, এবং তাদের মধ্যে কোন যোগাযোগের প্রমাণ নেই তবু এটা অসম্ভব নয় যে সপ্তদশ শতাব্দীর এই দুই মহারথী একে অপরকে প্রভাবিত করেছেন | 1687 সালে রাজা জেমস কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চান্সেলরকে আদেশ করেন কোন পরীক্ষা এবং শপথ না নিয়ে এক বেনেডিক্টপন্থী সন্ন্যাসীকে এম. এ. ডিগ্রী দিতে | ক্রুদ্ধ নিউটনের পরামর্শে ভাইস চান্সেলর রাজার আদেশ অমান্য করেন এবং রাজা পিছু হঠতে বাধ্য হন | মিল্টন ইতালী সফরের সময় গ্যালিলেওর সঙ্গে দেখা করেন যা বিজ্ঞান সম্পর্কে তাঁর গভীর আগ্রহের পরিচয় দেয় | নিউটনের পিতা বার্ণাবাস সুযোগসন্ধানী হিসাবে পরিচিত ছিলেন যিনি বিপ্লবের সময় সুকৌশলে নিজেকে সামলে নেন | পণ্ডিতদের ধারণা মিল্টন তাকে চিনতেন এবং কবিতায় তাঁর নিন্দাও করেছেন | নিউটন নিজেকে সত্যের অসীম সমুদ্রের তীরে বালুকাবেলায় নুডি সংগ্রহকারী বালকের সঙ্গে তুলনা করেছেন | উল্লেখনীয় যে প্রায় একই রূপকল্প মিল্টনের প্যারাডাইস লস্টেও আছে | নিউটনের ধর্মভাবনায়ও মিল্টনের প্রভাব লক্ষ্য করা যায় | পিতা ঈশ্বর, পুত্র যীশু পবিত্র আত্মা, খৃষ্টধর্মের এই ত্রিত্ত্ববাদ  নিউটন সরাসরি নাকচ করেন | অধিকাংশ পণ্ডিতদের মতে মিল্টনের অন কৃষ্টিয়ান ডক্ট্রিন গ্রন্থও ত্রিত্ত্ববাদ  বিরোধী | খৃষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে বিশপ আরিউস প্রথম ত্রিত্ত্ববাদের বিরোধিতা করেন কিন্তু তাকে নিরবাসিত করা হয় এবং 1548 থেকে 1612 খৃষ্টাব্দের মধ্যে অন্ততঃ আটজন ত্রিত্ত্ববাদ বিরোধীদের আগুনে পুডিয়ে মারা হয় | দার্শনিক জন লকেও ত্রিত্ত্ববাদ অস্বীকার করতেন |

জীবনের শেষভাগে নিউটন বহু অর্থ আত্মীয় ও অনাত্মীয়েদের দান করে যান | তিনি যে খুব রক্ষণশীল মানসিকতার লোক ছিলেন না তা তাঁর শেয়ার বাজারে অর্থ লগ্নি করা থেকে বোঝা যায় | রয়্যাল এক্সচেঞ্জ 1666 সালে লণ্ডনের বিদ্ধ্বংশী অগ্নিকাণ্ডে পুডে যাওয়ার পরে 1669 সালে  পুণর্ণির্মিত হয় ও এ সময়ে অন্যান্যদের মত নিউটনও শেয়ারে অর্থনিয়োগ করেন | ক্যাথারীন বার্টন বিবৃতি দেন যে সাউথ সী স্টকে তাঁর 20,000 পাউণ্ড অর্থনাশ হয় যা বর্তমান মূল্যমান অনুযায়ী বহু কোটি টাকা |

1727 খৃষ্টাব্দের 31 শে মার্চ চুরাশি বত্সর বয়সে নিউটনের মৃত্যু হয় | মৃত্যুশয্যায় চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী নিউটনকে যখন ঈশ্বরের কৃপালাভের জন্য স্যাক্রামেন্ট নিতে বলা হয় তখন তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন | তাঁর অনন্য কৃতিত্ত্বের স্বীকৃতি হিসাবে তাকে ওয়েষ্টমিনষ্টারে রাজাদের পাশে সমাহিত করা হয় |