গোপাল, বপ্যট, ধর্মপাল ও সিন্ধুপ্রান্তে এক প্রাচীন বঙ্গ

 

গোপালদেবের (৭৫৬-৭৭১ খ্রীঃ) পুত্র ধর্মপাল(৭৬৯-৮১৫ খ্রীঃ) বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট যার বিশাল সাম্রাজ্য নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে, তবু ধর্মপাল যেন প্রায় অধরাই রয়ে গিয়েছেন | তাঁর উপাধি উত্তরাপথ-স্বামী উত্তরাপথ ও উত্তরের রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সম্বন্ধের হদিস দেয় | তাঁর আরেক নাম ছিল বিক্রমশীল যা প্রবাদ প্রতিম বিক্রমাদিত্যের সঙ্গে  

 

                  

                      ধর্মপালের স্বর্ণমুদ্রায় দেবী লক্ষ্মী

 

যুক্ত| পালযুগে বৌদ্ধধর্মের গৌরবময় ঐতিহ্যের কথা সুবিদিত তবু এর পটভুমির বিশালতা আমাদের হতবাক করে | মানুষ ধর্মপাল সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না | তাঁর মুদ্রা, খালিমপুর তাম্রশাসন ও বৌদ্ধবিহারগুলি বাংলা ও বিহারের সঙ্গে তাঁর অতি ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সাক্ষ্য দেয় তবে তাঁর ভাবমূর্তি উত্তর ভারত কিম্বা বঙ্গ-মগধের বাইরেও অত্যন্ত উজ্জ্বল ছিল | তাঁর সুকৃতির প্রমান মেলে দেশ-দেশান্তরে সিন্ধু-প্রদেশে, সুদুর আফঘানিস্তানে, এমনকি দক্ষিপূর্ব এশিয়ায় রামরাট্টপালামবঙ্গে| ধর্মপালের প্রকৃত ইতিহাস লিখতে হলে হলে তাঁকে সর্বভারতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে হয় | বঙ্গ ও মগধের ভৌগলিক অবস্থানের যুক্তিযুক্ত বিশ্লেষণও ধর্মপালের ইতিহাসে আলোকপাত করে|

  অনতিপূর্বে সিন্ধুপ্রদেশ ও পূর্ববাংলা একই দেশের অংশ ছিল | রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে বাংলা ও সিন্ধু আজ বিছিন্ন, তবু এই দুই দেশের মধ্যে এক নিরন্তর আত্মীয়তার সাক্ষ্য দেয় ইতিহাস মহাভারত ও অন্যান্য গ্রন্থে উল্লিখত প্রাচীন বঙ্গ ছিল সিন্ধু অঞ্চলে | বাংলার ইতিহাসের এই গোড়ার কথা কিভাবে ঐতিহাসিকদের দৃষ্টি এডিয়ে গিয়েছে তা অতি আশ্চর্যজনক | জাত্যাভিমান, ধর্মীয় সংকীর্ণতা, দেশভক্তি ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তা ইতিহাসকে খর্ব করে | নীহাররঞ্জন রায় প্রত্নতত্বের ভিত্তিতে পূঁথিগত তথ্যের বাস্তবসাপেক্ষ ও যুক্তিসম্মত ব্যাখ্যা করার প্রচেষ্টা করেন তাঁর বাঙ্গালীর ইতিহাস গ্রন্থে | বর্তমান বাংলার গণ্ডীর বাইরেও যে বাঙ্গালীর ইতিহাস আছে এ বিশয়ে তিনি বিশেষ সচেতন ছিলেন | লঙ্কাজয়ী বিজয় সিংহ প্রসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন,

 

সিংহলী ইতিগ্রন্থ দীপবংশ মহাবংশে উল্লিখিত লাঢদেশী রাজপুত্র বিজয়সিংহ কর্তৃক সমুদ্রপথে সিংহলগমন এবং দ্বীপটি অধিকার ইত্যাদির গল্পৈতিহ্য বাঙালী কবি সত্যেন্দ্রনাথের কল্যাণে সুপরিচিত | কিন্তু এই লাঢদেশ কি প্রাচীন বাঙলার রাঢ জনপদ না প্রাচীন গুজরাট বা লাঢদেশ, এই লইয়া পণ্ডিতমহলে মতভেদ আছে...

 

উল্লেখনীয় যে পারস্য উপসাগরের তটবর্তী অঞ্চলে গৌড় এর নিকটেও এক লাঢদেশ আছে | নীহাররঞ্জন লেখেন যে সমুদ্রোপকুল বাহিয়া সিংহল-গুজরাট পর্যন্ত সমুদ্রপথের সুপ্রাচীন স্মৃতি বাংলার প্রচলিত গল্প কাহিনীগুলির মধ্যে ঢুকিয়া পরিয়াছিল | তবে তিনি না লিখলেও এ পথ যে শুধু সিংহল-গুজরাট পর্যন্ত সীমিত ছিল না এবং সিন্ধুপ্রদেশ ও আফঘানিস্তানও যে এর বৃত্তে ছিল তা সহজেই অনুমেয় | চণ্ডীমঙ্গলে কালকেতুর গুজরাট নগরী স্থাপনা কবিকল্পনা হলেও এর গভীরে প্রাচীন বাঙ্গালীর অভিযাত্রিক ইতিহাস ও বহমান ঐতিহ্যের প্রমাণ আছে | আফঘানিস্তানের হেরাট অঞ্চলের মাঘধী ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে ইণ্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ হাফিজুল্লা বাঘবান সম্প্রতি বহু চাঞ্চল্যকর তথ্য পেশ করেছেন যা বাংলার ইতিহাস ও ভাষা বিবর্তনের এক নুতন দিগন্তের সঙ্কেত করে |

   এই একাত্মতার সাক্ষ্য দেয় সিন্ধুর একতারাদোতারা | চর্যাপদের কবি ডোম্বীপা হয়তো ছিলেন সিম্ধু অঞ্চলের ডোম্বী জনগোষ্ঠীর বাঙ্গালী | চণ্ডীমঙ্গলের আদি কবি মানিক দত্ত অথচ সিন্ধুর মানিক ছিলেন হারুণ আল রশীদের চিকিত্সক যার খ্যাতি ছিল গ্রীক চিকিত্সকদের চেয়েও বেশী | বাংলা ও সিন্ধিভাষার মধ্যে মিলের কথা ভাষাবিদ জে. বীমস্ উনবিংশ শতাব্দীতে উল্লেখ করলেও তা নিয়ে কেউ বিশেষ মাথা ঘামান নি | ভারতবিদ কনরাড এলষ্ট্ লিখেছেন যে বাংলা ও সিন্ধুর মধ্যে ভাষার সাযুজ্য ছাডাও ছিল এক সাংস্কৃতিক একতা যার পশ্চাতপটে ছিল সিন্ধু ও গঙ্গানদীর বিস্তীর্ণ অববাহিকা | সিন্ধুর তট্টার সঙ্গে সমতটের যোগ আছে|

ধর্মপাল ও গোপালকে চিনতে হলে সিন্ধু, উত্তরাপথ ও দুই গৌডের কথা মনে রাখতে হয় | গোপাল যে শুধু বাংলার রাজা ছিলেন না একথা মনে রাখলে তাঁকে সহজে চেনা যায় | তাঁর বংশ পরিচয় সম্পর্কে শুধু এইটুকুএ জানা আছে যে তাঁর পিতা ছিলেন শত্রু ধ্বংসকারী বপ্যট | এই শত্রুরা কারা তা নির্ণয় করতে পারলেই শত্রু ধ্বংসকারী বপ্যটকে চেনা সম্ভব | যদি ধরে নেওয়া হয় যে তাঁর রাজ্যকালের পুর্বে যে মাত্সন্যায়ের উল্লেখ আছে তার প্রেক্ষাপট শুধু বাংলা নয়, পান্জাব, সিন্ধু ও রাজস্থানও, তবে সহজেই শত্রুদের চেনা যায় আরব হিসাবে যাদের নেতা মহম্মদ বিন কাশীম ৭১১ খ্রীষ্টাব্দে সিন্ধুরাজ দাহির সেনকে পরাজিত করে | তবে এ সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হয় নি | ৭৩৮ খৃষ্টাব্দে বিখ্যাত রাজস্থান যুদ্ধে গুর্জর প্রতিহার, চৌহান ও গুহিলটদের সম্মিলিত প্রতিরোধে আরবরা সম্পুর্ণরূপে পরাজিত হয় | এই যুদ্ধের নায়ক ছিলেন শত্রু ধ্বংসকারী বাপ্পা রাওয়াল যার পুত্র খম্মানের উল্লেখ আছে চিতোর বিজয়ী হিসাবে | এই শত্রু নিধনকারী বাপ্পা রাওয়াল (অথবা তাঁর ভাই) হতে পারেন বপ্যট | রাওয়াল হয়তো রামপালেরই এক পরিবর্তিত রূপ |

প্রকৃতপক্ষে বাংলা ও সিন্ধুর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্ত্বপূর্ণ যোগসূত্র ছিল বৌদ্ধধর্ম | কেবলমাত্র ঐতিহাসিকদের অবিমৃশ্যকারিতার জন্যই বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে বাংলা ও সিন্ধুর নিবিড় সম্পর্ক আপাতদৃষ্টিতে বিস্ময়কর মনে হয় | আসলে কপিলবস্তু ছিল সিন্ধুপ্রদেশের নিকটে আফঘানিস্তানে, নেপালে নয়| সম্প্রতি টি. এ. ফেল্পস্ দেখিয়েছেন যে ডঃ ফুয়েহরারের নেপালে লুম্বিনী আবিস্কার আসলে একটি নির্লজ্জ জালিয়াতি | নেপালের প্রাচীন ইতিহাস, সাহিত্য অথবা প্রত্নতত্ত্বে বৌদ্ধধর্র্মের কোন আভাসমাত্রও নেই | রমীলা থাপার ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের দিলীপ চক্রবর্তী বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও বোঝা যায় য়ে কপিলবস্তু ছিল সিল্ক রোডের বৃত্তে | নেপালী মিথ্যার ঝুলি বাতিল না করে বিশ্ব ইতিহাসের সুষ্ঠু চর্চা অসম্ভব |

     রাষ্ট্রকূট রাজাদের লেখে ধর্মপালকে ভঙ্গল দেশের রাজা বলা হয়েছে, এবং তাঁর স্বর্ণমুদ্রায়ও ভঙ্কলের নাম আছে | এছাডা সমতটের রাজা আনন্দদেবের উপাধি ছিল ভঙ্গলমৃগাঙ্ক, কিন্তু এই ভঙ্গলদেশ নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে | আন্দ্রে উইঙ্ক বিষয়টির গভীরত্ত্ব অনুধাবন না করে লিখেছেন যে ভঙ্গল নামটি ভঙ্গ নামেরই এক প্রতিরূপ কিন্তু দিনেশ চন্দ্র সরকার লেখেন যে এদুটি পৃথক অঞ্চল ছিল | ভঙ্গল দেশের ভৌগলিক অবস্থান নির্ণয় করা ও ধর্মপালের ইতিহাসের সত্যনিষ্ঠ ও সুষম বিবরণ নবীন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় |

সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসের প্রথম সোপান জোনসের চমকপ্রদ পাটনায় পালিবোথ্রা আবিস্কার নস্যাত্করা | মৌর্য রাজধানী পাটনায় ছিল রমীলা থাপারের একথা ডাহা মিথ্যা, যদিও পাঠ্য পুস্তক গুলি এই মিথ্যাপ্রচার করে | প্রত্নতাত্ত্বিকেরা পাটনায় মৌর্য অথবা নন্দরাজেদের একটিও নিদর্শন পান নি | দিলীপ চক্রবর্তী দাবী করেন যে জোনসের তথাকথিত পালিবোথ্রা আবিস্কারের প্রমাণ মেলে হুয়েন সাঙের ভ্রমণকাহিনীতে, কিন্তু তিনি আসেন মৌর্যদের বহু শতাব্দী পরে কাজেই তাঁর সাক্ষ্য মৌর্য ইতিহাসের দলিল নয় | অশোকের কালে পাটনা অঞ্চল মগধ ছিল কিন্তু তার পুর্বে মগধ

 

                        কোনারক, কনৌজ, গৌড, পুরী ইত্যাদি নাম আরেক ভারত ইঙ্গিত করে  

 

ও কলিঙ্গ ছিল বালুচিস্তান অঞ্চলে | পারস্য উপসাগরের তটবর্তী এলাকায় কোনারক, কটক, পুরী, গৌড, কনৌজ ইত্যাদি নামের শহরগুলি থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে এ অঞ্চলই (যা মগন নামে পরিচিত ছিল) প্রাচীন মগধ ছিল | শিশুনাগ, কাকবর্ণ প্রভৃতি প্রাচীন মগধের রাজার নাম বিহারে খোজা বাতুলতা কিন্তু এদের সহজেই মেলে বালুচিস্তানের পশ্চিমে | মৌর্য রাজধানী পাটনা ধরে নিলে তাদের সামুদ্রিক বাণিজ্য নিয়ে এইচ. পি. রায় যে বিশাল গ্রন্থ লিখেছেন তার অনেকটাই হৃদয়ঙ্গম করা কঠিন |   

পারস্য উপসাগরের তটবর্তী এলাকায় এক প্রাচীন ভারতের প্রমাণ পাওয়া যায় ইসলামী লেখকদের বিবরণে| উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দ্রে উইঙ্ক বিষয়টি সঠিক আঁচ করতে না পেরে সরল ভঙ্গিতে লিখেছেন

 

প্রকৃতপক্ষে উত্সগ্রন্থগুলিতে সিন্ধু নয়, বরং মকরাণ এবং পারস্য উপসাগরের অভিনুখ, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল আল-উবুল্লা নগর এবং এমনকি সোকোত্রা দ্বীপও, তাকে বলা হয়েছে ফর্জ আল-হিন্দ অর্থাত্ ভারতের সীমান্ত | অন্যত্র একে বলা হয়েছে অর্দ আল-হিন্দ যার অর্থ ভারতের এলাকা ....

 

রমেশ মজুমদারও বসরা সংলগ্ন উবুল্লা যে ভারত নামে পরিচিত ছিল একথা লেখেন কিন্তু তিনি কল্পনাও করতে পারেননি যে প্রাচীন ভারত

 

 

এককালে এতটাই বিস্তৃত ছিল এবং এই উবুল্লাই ছিল উরূভেলা যেখানে গৌতম বুদ্ধ প্রথম ধর্মপ্রচার করেন | বালুচিস্তান অঞ্চলে এক বঙ্গদেশের  হদিস পাওয়া যায় বঙ্গাশ জনগোষ্ঠীর ইতিহাস থেকে | বাংলার বিশিষ্ট সরোদবাদক আমজাদ আলী খান বঙ্গাশ গোষ্ঠীর মানুষ যিনি এক অর্থে খাঁটি বাঙ্গালী | কনৌজের সঙ্গে ধর্মপালের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল কিন্তু কনৌজের শাষকেরা ছিলেন বঙ্গাশ সম্প্রদায়ের, যাদের বাস্তুভিটা ছিল আফঘানিস্তান ও পাকিস্তান | এই গোষ্ঠীর আরেক বসতি ছিল খোরাসানে যেখানে প্রাচীন গৌড় নগর ছিল | পারসীদের পদবি বেঙ্গালী পারস্যের বঙ্গাশদের সঙ্গে বাঙ্গালীর বিস্মৃত আত্মীয়তার হদিস দেয় | কিছুটা যেন গল্পচ্ছলে, বিষয়টি হৃদয়ঙ্গম না করে উইকিপিডিয়া উল্লেখ করে যে ধর্ম-পালের রাজত্বকালে পূরব ইরানে ভারতীয় বৌদ্ধধর্মের প্রভাব ছিল |

 

                    যবনরাজ্য ও ভঙ্গল (করাচীর নিকটে বনভোর) ছিল ধর্মপালের অধীনে   

কপিলবস্তুর প্রকৃত অবস্থান থেকে অবেস্তার ভাষার সঙ্গে পালির যোগসূত্র অনুমান করা যায় | এই গৌড়ের চিত্রকীর্তি অজন্তার সমরূপ |

সিন্ধু প্রদেশে বহু বৌদ্ধ ছিল কিন্তু তাঁরা যুদ্ধে দাহির সেনের পক্ষ সমর্থন করে নি কেননা সেন আমলে সিন্ধুপ্রদেশে বৌদ্ধদের ব্যক্তি স্বাধীনতা ছিল না | এ সুবাদে সিন্ধুর বহিরাগত যবন শাসকদের সঙ্গে প্রথমে বৌদ্ধদের মোটামুটি সুসম্পর্ক ছিল যদিও পরবর্তীকালে এটা বজায় থাকে নি | রাজস্থানের যুদ্ধে হিন্দু ও বৌদ্ধেরা একযোগে সংগ্রাম করে | তবে তারানাথ ও অন্যান্য লেখকদের বিবরণ থেকে বোঝা যায় সিন্ধুর বৌদ্ধরা মহাযান ও তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের ঘোরতর বিরোধী ছিলেন | এদের মধ্যে দুজনের নাম ছিল পুর্ণদাস এবং ধর্ম-ভীম | ধর্মপালকে সাধারণতঃ বাংলা ও বিহারের রাজা বলা হয় যার অধীনে সামন্ত রাজ্য হিসাবে ছিল কনৌজ | এছাডাও মদ্র, কম্বোজ, গান্ধার, রাজ-পুতানা, মালব, বেরার ও যবন দেশ ছিল তাঁর করদ রাজ্য | এমনকি নেপালকেও তাঁর করদ রাজ্য মনে করা হয় | দক্ষিণ-পুরব এশিয়ার শৈলন্দ্র রাজারাও ধর্মপালের আধীনত্য স্বীকার করতো | তাঁর তিন লক্ষ সেনার মধ্যে বাঙ্গালী ও বিহারী ছাডাও বহু জাঠ, মিড, রাজপুত, নেপালী ও এমনকি তিব্বতী যোদ্ধাও নিশ্চয় ছিল |   

সাংস্কৃতিক ভাবে প্রাচীন মগধ, বঙ্গ ও কলিঙ্গের সঙ্গে যুক্ত ছিল কাজেই মগধ ও কলিঙ্গ বালুচিস্তান অঞ্চলে থেকে থাকলে সিন্ধু অঞ্চলে নিশ্চয় আরেক প্রাচীন বঙ্গ ছিল | বাংলার শাসকদের মধ্যে অনেকের নাম ছিল কম্বোজ যা এই উত্তরাঞ্চলের বঙ্গের সঙ্গে সম্বন্ধিত | বঙ্গ নামটির মত ভঙ্গল ও সমতটও পুর্ব ও পশ্চিম দুই অংশেই ছিল | সিন্ধুর তট্টার সঙ্গে বাংলার সমতটের সাদৃশ্য লক্ষ্য করেন বিশিষ্ট ভুগোলবিদ রেনেল | এই অঞ্চল প্রাচীন বৌদ্ধ-ধর্মের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত যার নাম আখামেনীয় যুগে ছিল তথাগুশ | সিন্ধুর একটি নগরের নাম ছিল বঙ্গবিলাস |

বঙ্গ (বঙ্গওয়ে) নামটিও সিন্ধু-বালুচিস্তানে-আফঘানিস্তান অঞ্চলের বহু প্রাচীন মানচিত্রে পাওয়া যায় | আল-ওয়ারিন(৪) ছিল সিন্ধুদেশের বারেন্দ্রভুমি যা ছিল তট্টার দক্ষিণে | বিখ্যাত নগরী জারান্জ (৫) মনে হয় ছিল দ্বার-অঙ্গ | বঙ্গওয়ে (৭) নিশ্চয়ই ভঙ্গল যা ছিল বুস্ত নগরের

 

                        ইবন হউকালের মানচিত্রে আল-ওয়ারিন ও বঙ্গওয়ে

পূর্বে | Delisle এর(১৭২৪ খ্রীঃ) মানচিত্রেও বঙ্গওয়ে দেখান হয়েছে জারান্জের দক্ষিণ-পুর্বে | আপাতদৃষ্টিতে এ নগরের নাম অজানা মনে হলেও স্মরণ করতে হয় যে ভঙ্গল ছিল এককালের অত্যন্ত গুরুত্ত্বপূর্ণ বন্দর | এ অঞ্চলের সবচেয়ে বিখ্যাত বন্দর নগরী ছিল দেবল যার প্রতিধ্বনি শোনা যায় সমতটের রাজধানীর নাম দেবপর্বতে | দেবল বন্দরের নাম পরে হয়ে যায় বনভোর যা ভঙ্গল () নামেরই ভিন্নরূপ | এখানে একটি উচ্চাবাস (১৮৪০ X ৯২০ ফুট) আবিস্কৃত হয়েছে য়ার উচ্চতা ছিল ত্রিশ ফুট | ভঙ্গলের এই উচ্চাবাসকেই হয়তো দেবপর্বত বলা হয়েছে | এখানে শিবলিঙ্গ ও বৌদ্ধযুগের বহু নিদর্শন আবিস্কৃত হয়েছে | কথিত আছে যে সিন্ধু বিজয়ের পরে মহামতি আলেকজাণ্ডার দেবল (অথবা তট্টা) নগরে আসেন | এখানে একটি প্রাচীন শিল্পনগরী আবিস্কৃত হয়েছে যেখানে কাঁচের সামগ্রী তৈরী হত এবং ধাতু গলিয়ে অস্ত্র ও অন্যান্য যন্ত্রাদি প্রস্তত করা হোত |

 

 

                  বিগত কয়েক দশকে বনভোরে (ভঙ্গল) বহু প্রত্নতাত্ত্বিক সামগ্রী আবিস্কৃত হয়েছে

 

     ধর্মপালের সঙ্গে রাষ্ট্রকূটদের মনে হয় সুসম্পর্ক ছিল এবং তিনি রাষ্ট্রকূট রাজকন্যা রন্নাদেবীকে বিবাহ করেন | রাষ্ট্রকূটদের বংশপরিচয় নিয়ে নানা সন্দেহ আছে তবে তারা নিজেদের যাদবকুলের সাত্যকীর বংশধর বলিয়া দাবী করেন | ইসলামীয় লেখক সুলেমান ধর্মপালকে রূহমী নামে অভিহিত করেছেন | প্রখ্যাত ঐতিহাসিক মাসূদীর বিবরণে ধর্মপালের নাম রাহমা যা ঐতিহাসিকদের বিস্মিত করেছে | রাহমা হয়তো ভঙ্গলের (দেবল) নিকটবর্তী রেহেম অঞ্চলের সঙ্গে সম্বন্ধিত | সন্ধ্যাকর নন্দী পালরাজাদের বংশপরিচয় প্রসঙ্গে লেখেন যে তাঁরা ছিলেন সমুদ্রকুলের, যা তাদের সিংহল গুজরাট হয়ে ভঙ্গল পরযন্ত বিস্তৃত সমুদ্রপথের সঙ্গে যোগাযোগের ইঙ্গিত করে | বৈদ্যদেবের লেখে পালরাজাদের গোত্র সম্বন্ধে বলা হয়েছে মিহিরস্য বংশ যার এক অর্থ সূর্য বংশ কিন্তু স্মরণীয় যে মাসূদীর লেখায় সিন্ধুনদীর নাম ছিল মিহরাণ |

বানিজ্যিক দিক থেকে দেবল (ভঙ্গল) ছিল অত্যন্ত গুরুত্ত্বপূর্ণ কেননা মিশর ও পশ্চিমমুখি পণ্যের জন্য এই বন্দর ছিল কেন্দ্রস্থল | এছাডাও ভঙ্গল থেকে উত্তরের সিল্ক রোড পর্যন্ত একটি স্থলপথ ছিল যার বানিজ্যিক গুরুত্ত্ব ছিল অসীম এবং এই পথে অগনিত বৌদ্ধমঠ ছিল | এই মঠগুলিতে প্রচুর মুদ্রা পাওযা যায় যা বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে বানিজ্যের এক ঘনিষ্ঠ

 

                                বেল্লিন-কৃত মানচিত্রে (১৭৪০ খ্রীঃ) দেবল, তট্টা ও রেহেম

 

সম্পর্কের ইঙ্গিত করে ও এই ধর্মকে আপামর জনসাধরণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে | দেবল মৌর্য় রাজাদেরও সমুদ্রপথ বাহিত বানিজ্যের কেন্দ্রস্থল ছিল | হতে পারে দেবলই ছিল মেগাস্থেনেস উল্লিখ্ত পালিবোথ্রা |

গোপালের পিতা বাপ্পা রাওয়াল অথবা রামপাল রামায়ণের রামের বংশধরও হতে পারেন | রাম বিশ্ব ইতিহাসের এক বরেণ্য রাজা ছিলেন[1] য়াঁর ইতিহাস জোনসীয় লেখকেরা যারপরনাই বিকৃত করে এক হাস্যকর পর্যায়ে নামিয়ে এনেছেন |


 

[1] http://www.ranajitpal.com দ্রষ্টব্য |